দীপালীকে মনে রাখে নি কেউ

-কাইয়ুম আহমেদ
কেউ মনে রাখেনি ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির সেই দীপালীর কথা। ৮৩ সালের ওই দিনটিতে ছোট্ট দীপালী এসেছিল শিশু একাডেমিতে। স্বপ্ন একটা গানের কোকিল হয়ে উঠার। কিন্তু ওর স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল পুলিশের বুলেট। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সব। সেদিন কাঞ্চন নামে আরও এক জনের মৃত্যু হয়। তাকেও মনে পড়ে না কারোই। সেই দীপালীকে মনে রাখে নি কেউ। তবে ‘দীপালীদের’ স্বপ্ন আরও সৃসংহত করতে সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় সব ছাত্র সংগঠন নিয়ে।
অবৈতনিক বৈষম্যহীন সেক্যুলার শিক্ষানীতির দাবিতে ওই দিন রাজপথে নামলো কয়েকশ শিক্ষার্থী। সেসময়ে সূর্যসেন হলের ছাত্রলীগের সভাপতি জহুরুল ইসলাম টুকু ভাইও ছিলেন। তবে তিনি দীপালীকে মনে না রাখলেও সেই ঘটনা মাঝে মাঝে আওড়ান। সেদিন সবেমাত্র দশম শ্রেণির ছাত্র আমি। কেবল বুঝতে শিখছিলাম রাজনীতি। আজ প্রায় ৩১ বছর পর কেন যেন সেই দীপালীর কথা মনে পড়ছে।

সাম্প্রদায়িকতা, শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণ আর শিক্ষা সংকোচন- কে ভিত্তি ধরে প্রণিত ‘মজিদ খান শিক্ষানীতি’র বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছাত্রসমাজ শ্লোগানে মুখর।মিছিলের অগ্রভাগে মেয়েরা। রাস্তায় পুলিশের বাধা। হাইকোর্টের গেট এবং কার্জন হল সংলগ্ন এলাকায় কাঁটাতারের সামনে এসে ছাত্রীরা বসে পড়ে। নেতৃবৃন্দ কাঁটাতারের উপর দাঁড়িয়ে জানাতে থাকে বিক্ষোভ। এ সময় বিনা উস্কানিতে অতর্কিত পুলিশ হামলার চালায় সভায়।গরম পানি ছিঁটিয়ে গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। সভার একাংশে ছাত্রদের ওপর তুলে দেওয়া হয় ট্রাক। নিহত হয় জয়নাল, দিপালীসহ অনেকে। শিশু একাডেমীর অনুষ্ঠানে যোগদান দিতে আসা দীপালী মারা গেল পুলিশের গুলিতে। তার লাশ গুম করে ফেললো পুলিশ। জয়নালের গুলিবিদ্ধ দেহকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে তবে শান্ত হয় এরশাদ জান্তারা। রাজনৈতিক নেতারা কেউ কেউ কলা ভবনে আসতে শুরু করেন সমবেদনা ও সংহতি জানাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে অবস্থান নিয়ে পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালায়। পুলিশের প্রথম লক্ষ্য, মরদেহগুলো উদ্ধার, যাতে লাশ নিয়ে কোনো মিছিল বেরোতে না পারে। এরই মধ্যে অন্তত একজনের লাশ নিয়ে একদল ছাত্র উপাচার্যের দপ্তর যে ভবনে, সেই রেজিস্টার বিল্ডিংয়ে ঢুকে পড়ে। শীতের বিকেলে দ্রুত সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে সেনাসদস্যরা অবস্থান নিতে শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে বেরোনোর সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর শহরেও কারফিউ জারি করা হয়। 
প্রসঙ্গত, ১৯৮২ সালের ১৪ মার্চ, সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করেন স্বৈরাচার এরশাদ সরকার। সামরিক আইনজারি করে মৌলিক অধিকারের ভূ-লুণ্ঠন এবং বিরোধী দলীয় কর্মী ধরপাকড়, নির্যাতনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এরশাদ আমল। সেই সময় ছাত্র আন্দোলনের পালে হাওয়া লাগায় ‘মজিদ খান শিক্ষানীতি।’ সাম্প্রদায়িকতা, শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণ আর শিক্ষা সংকোচনকে ভিত্তি ধরে প্রণিত ‘মজিদ খান শিক্ষানীতি’র বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব ও শিক্ষার ব্যয়ভার যারা ৫০% বহন করতে পারবে তাদের রেজাল্ট খারাপ হলেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়- ওই শিক্ষানীতিতে। গণবিরোধী এই শিক্ষানীতির প্রতিবাদে, তিলে তিলে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন ফুঁসে ওঠে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। ওই আন্দোলন পরেও আগায় আরও। ১৫ তারিখ আন্দোলন আরো ছড়িয়ে পড়লে নির্যাতনের পাল্লা বাড়তে থাকে। চট্টগ্রামে প্রতিবাদী কাঞ্চন নিহত হয় ১৫ তারিখ। কয়েকশ ছাত্রকে নির্বিচারে আটক করা হয়, অত্যাচার চালানো হয়। বর্তমানে যেখানে শাহবাগ থানা সেখানটায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় ঘণ্টার ঘণ্টা। সে দৃশ্য আজ আর মনকে ব্যথিত করে না হাজার দীপালীর মৃত্যুর মিছিলে। তবে কেউ মনে রাখে নি সেই ছোট্ট দীপালীকে। তার স্মরণে দীপালী যুব সংঘ প্রতিষ্ঠা করা হলেও সেটির অস্তিত্ব আছে বলে জানা নেই।


মন্তব্যসমূহ